Literature

585
SHARES
3.2k
VIEWS

  অভিমানী মন

  মধুসূদন পাল

অচেনা এক উদাসী বিকেল,
        নিঃসঙ্গ পথ-ছিলাম একাকী!
হটাৎ এক স্বপ্ন ছুঁয়ে গেলো,
         মনে আভাস দিলো উষ্ণতা!
মন আজ ভোরের আলোয়,
        দিশেহারা–তুমি অভিমানী!
সে স্বপ্ন কি শুধুই
                    স্বপ্ন ছিলো?
এর উত্তর আজও
    খুঁজি নিঃসঙ্গ বিকেলে!!
আজ যখন সবকিছু ভুলে
          এক নতুন স্বপ্নে রত,
তবু মন ছুটে যায়
           তোর গলির কিনারায়!
একটিবার তোর ইশারা
            পড়ুক আমার মোহনায়!
কিন্ত মিথ্যে সবই রইলো
        আমার চাওয়া-পাওয়া!
তোমার মাঝে দেখেছি
           কেবলই অভিমানী নেশা!

 

অমিতাভ দত্ত

চালাকি, চাতুরী, ঈর্ষা, ঘোঁট পাকানো, হিংসা, চক্রান্ত, মানুষকে পাশ কাটানো, যথাযোগ্য মর্যাদা না দেওয়া, তাচ্ছিল্য করা, সুস্থ নিয়ম কে অগ্রাহ্য করা, সুস্থ সুন্দর পরিবেশকে কালিমালিপ্ত করা, স্বাভাবিকত্ব অর্জনে যত্নবান না হওয়া, মানসিক নির্যাতন, যোগ্য মানুষের যোগ্য কাজকর্মের জন্য প্রশংসা সম্মান না দেওয়া, সততা পূর্ণ আলোচনা এবং সমালোচনা না করা, সাংগঠনিক নিয়মকে লঙ্ঘন করে যা খুশি নিজের মন-মর্জি মোতাবেক চলা, অযথা অশান্তি সৃষ্টি করা, সমগ্র পৃথিবীর মানব সমাজের ঘটনাবলীকে মানবতাবাদী দৃষ্টি ধারায় না দেখা, ইত্যাদি ইত্যাদি সমস্ত কুপ্রভাব , সমাজের বুকে বহু পুরাতন ব্যাধি, তা আমরা তাঁর লিখিত এই উদ্ধৃতির মধ্য দিয়েই উপলব্ধি করতে পারি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তা লক্ষ্য করেছেন, এবং খুবই বলিষ্ঠ রূপে তা আমাদের জানিয়েছেন। কোথায় চলেছি আমরা! মানসিক রোগীতে পরিণত হচ্ছি না তো আমরা ! দিন দিন আমরা কেমন জানি মনোজগতের কাছে দরিদ্র হয়ে পড়ছি বলেই মনে হয়। এবং তা ভাবলেও ভীষণ ভয় হয়।

শুভ দীপাবলি

শিশির কুমার দাস
কৃষ্ণ কলি বলি যারে!
সেই তো তুই শ্যামা মা রে!
মনের প্রদীপ তোরই তরে!
জ্বলুক আলো হৃদয় জুড়ে।
তুবড়ি বাজি স্তব্ধ হোক!
ঈর্ষা কলুষ জব্দ হোক।
বন্ধ হোক সব জীব হত্যা!
বেঁচে থাকুক মানব সত্তা।
শাপ পাপ তাপ মুছে যাক !
খুশির আলো ভরে থাক!
তোর ঐ কালো রূপে ভুবন আলো মাতে!
আকাশ বাতাস ভরে ওঠে আলোকসজ্জা রাতে।
অমানিশির তমসা মাঝে প্রদীপখানি জ্বালি!
ঐ দীপেরই আলোর ছটায় ঘুচুক আঁধার কালি।
মনের যত মলিনতা জাত পাত যাক ভেঙে!
শুভ শক্তির উদয় হোক দীপান্বিতার রঙে।
২৩ অক্টোবর ২০১২ তারিখে হৃদ্‌যন্ত্রজনিত অসুস্থতার কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে ৪ এপ্রিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতার ‘গণদর্পণ’-কে সস্ত্রীক মরণোত্তর দেহ দান করে যান। কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একমাত্র পুত্রসন্তান সৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ইচ্ছেতে তার দেহ দাহ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ব্যবস্থাপনায় ২৫ অক্টোবর ২০১২ তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর প্রয়াত হন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
“কারাগারের ভিতরে পড়েছিল জোছনা
বাইরে হাওয়া, বিষম হাওয়া
সেই হাওয়ায় নশ্বরতার গন্ধ
তবু ফাঁসির আগে দীনেশ গুপ্ত চিঠি লিখেছিল তার বৌদিকে,
“আমি অমর, আমাকে মারিবার সাধ্য কাহারও নাই।”
মধ্যরাত্রির আর বেশি দেরি নেই
প্রহরের ঘণ্টা বাজে, সান্ত্রীও ক্লান্ত হয়
শিয়রের কাছে এসে মৃত্যুও বিমর্ষ বোধ করে।
কনডেমড সেলে বসে প্রদ্যুত ভট্টাচার্য লিখছেন,
“মা, তোমার প্রদ্যুত কি কখনো মরতে পারে ?
আজ চারিদিকে চেয়ে দেখ,
লক্ষ প্রদ্যুত তোমার দিকে চেয়ে হাসছে,
আমি বেঁচেই রইলাম মা, অক্ষয়”
কেউ জানত না সে কোথায়,
বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ছেলেটি আর ফেরেনি
জানা গেল দেশকে ভালোবাসার জন্য সে পেয়েছে মৃত্যুদণ্ড
শেষ মুহূর্তের আগে ভবানী ভট্টাচার্য
পোস্ট কার্ডে অতি দ্রুত লিখেছিল তার ছোট ভাইকে,
“অমাবস্যার শ্মশানে ভীরু ভয় পায়,
সাধক সেখানে সিদ্ধি লাভ করে,
আজ আমি বেশি কথা লিখব না
শুধু ভাববো মৃত্যু কত সুন্দর।”
লোহার শিকের ওপর হাত,
তিনি তাকিয়ে আছেন অন্ধকারের দিকে
দৃষ্টি ভেদ করে যায় দেয়াল, অন্ধকারও বাঙময় হয়
সূর্য সেন পাঠালেন তার শেষ বাণী,
“আমি তোমাদের জন্য কি রেখে গেলাম ?
শুধু একটি মাত্র জিনিস,
আমার স্বপ্ন একটি সোনালি স্বপ্ন,
এক শুভ মুহূর্তে আমি প্রথম এই স্বপ্ন দেখেছিলাম ।”
সেই সব স্বপ্ন এখনও বাতাসে উড়ে বেড়ায়
শোনা যায় নিঃশ্বাসের শব্দ
আর সব মরে স্বপ্ন মরে না
অমরত্বের অন্য নাম হয়
কানু, সন্তোষ, অসীম রা…
জেলখানার নির্মম অন্ধকারে বসে
এখনও সেরকম স্বপ্ন দেখছে। “
: সেই সব স্বপ্ন
এই কবিতার স্রষ্টা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্ব বলা যায় তাকে। ছিলেন সব মাধ্যমে সক্রিয়। লেখাকেই পেশা হিসেবে নেওয়া সুনীলের সৃষ্টি সম্ভার বিপুল। লিখতেন “নীললোহিত”, “সনাতন পাঠক”, “নীল উপাধ্যায়” ছদ্মনামেও।
জীবনাচারে ও কর্মে কবি হলেও সুনীলের ‘প্রথম আলো’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’, ‘সেই সময়’ উপন্যাসসমূহ কালজয়ী হিসেবে গণ্য হয়। জীবনকালেই কিংবদন্তি হয়ে তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একক মশাল। বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম নেওয়া সুনীল অর্জন করেন ‘আনন্দ পুরস্কার’ ও ‘সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার’।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪, ২১ ভাদ্র, ১৩৪১ বঙ্গাব্দ – ২৩ অক্টোবর ২০১২) বিংশ শতকের শেষার্ধের এক জন প্রথিতযশা বাঙালি সাহিত্যিক। ২০১২ খ্রিস্টোব্দে মৃত্যুর পূর্ববর্তী চার দশক তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা-ব্যক্তিত্ব হিসাবে সর্ববৈশ্বিক বাংলা ভাষা-ভাষী জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাপক ভাবে পরিচিত ছিলেন। এই সাহিত্যিক একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সম্পাদক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসাবে অজস্র স্মরণীয় রচনা উপহার দিয়েছেন। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার জীবনানন্দ-পরবর্তী পর্যায়ের অন্যতম প্রধান কবি। একই সঙ্গে তিনি আধুনিক ও রোমান্টিক। তাঁর কবিতার বহু পংক্তি সাধারণ মানুষের মুখস্থ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় “নীললোহিত”, “সনাতন পাঠক” ও “নীল উপাধ্যায়” ইত্যাদি ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুরে। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। ১৯৫৩ সাল থেকে তিনি কৃত্তিবাস নামে একটি কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। ১৯৫৮ খ্রিস্টোব্দে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ এবং ১৯৬৬ খ্রিস্টোব্দে প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’ প্রকাশিত হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হল ‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি’, ‘যুগলবন্দী (শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে), হঠাৎ নীরার জন্য, রাত্রির রঁদেভূ, শ্যামবাজারের মোড়ের আড্ডা, অর্ধেক জীবন, অরণ্যের দিনরাত্রি, অর্জুন, প্রথম আলো, সেই সময়, পূর্ব পশ্চিম, ভানু ও রাণু, মনের মানুষ ইত্যাদি। শিশুসাহিত্যে তিনি “কাকাবাবু-সন্তু” নামে এক জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজের রচয়িতা। মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত তিনি ভারতের জাতীয় সাহিত্য প্রতিষ্ঠান সাহিত্য অকাদেমি ও পশ্চিমবঙ্গ শিশুকিশোর আকাদেমির সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

প্রিয় জীবনানন্দ দাশ, 

নির্জনতা কি পেলেন অবশেষে? আজ ২২ অক্টোবর আপনার প্রয়াণবার্ষিকীর ক্ষণে এমন বহু জিজ্ঞাসায় ভরা মন।
আপনাকে খুঁজতে বরিশাল গেছি। বগুড়া রোড থেকে বিএম কলেজ অবধি হেঁটেছি। আস্ত এক দোকানের শহর তা এখন। রাস্তা চওড়া হয়েছে। ফুটপাতও ভালো। কিন্তু দোকান ছাড়া আপনার জন্মভূমির যেন উপস্থাপনের আর কিছু নেই।
সারা বিকেল একবার বিএম কলেজ চষে বেড়িয়েছি। সেখানে শুধু আপনার নামটুকুই আছে এক ভবনে। তীব্র শব্দের মোটরবাইক বহরে ছাত্রনেতা নামধারী ক্যাডারদের প্রকট উৎপাত চোখে পড়ে। আপনার কবিতায় ছেয়ে থাকা ক্যাম্পাসের সব দেয়াল প্রত্যাশী ছিলাম। বাস্তবে তা দেখিনি।
আপনার ধানসিঁড়িকে আর নদী বলার কারণ নেই। দখলে, দূষণে এখন তা খাল। আন্দাজ করি, কিছু দিনের মধ্যে তা ড্রেন হবে। আপনি অদেখা ভুবনে পাড়ি দেওয়ার প্রায় ৭০ বছর হয় হয়। এর মধ্যে ‘রূপসী বাংলা’ ছারখার। অনাসৃষ্টি দিকে দিকে। আপনার ‘কয়েকটি লাইন’ এর মর্মার্থ আমরা টের পাইনি।
“…
উৎসবের কথা আমি কহিনাকো,
পড়িনাকো ব্যর্থতার গান;
শুনি শুধু সৃষ্টির আহবান,-
তাই আসি
নানা কাজ তার
আমরা মিটায়ে যাই,-
জাগিবার কাল আছে-দরকার আছে ঘুমাবার;-
এই সচ্ছলতা
আমাদের;- আকাশ কহিছে কোন কথা
নক্ষত্রের কানে?-
আনন্দের? দুর্দশার?-পড়িনাকো-সৃষ্টির আহবানে
আসিয়াছি।. .  ”
আপনাকে নিয়ে বিনয় মজুমদারের কবিতা পড়ে মনেহয়, আপনি আজও একলা। হয়তো আছেন কিছু উড়ুক্কু চিল বেষ্টিত হয়ে।
‍‍‍‍‍
“ ধূসর জীবনানন্দ, তোমার প্রথম বিস্ফোরণে
কতিপয় চিল শুধু বলেছিলো, ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‘এই জন্মদিন’।
এবং গণনাতীত পারাবত মেঘের স্বরূপ
দর্শনে বিফল ব’লে, ভেবেছিলো, অক্ষমের গান।
সংশয়ে-সন্দেহে দুলে একই রূপ বিভিন্ন আলোকে
দেখে দেখে জিজ্ঞাসায় জীর্ণ হয়ে তুমি অবশেষে
একদিন সচেতন হরীতকী ফলের মতোন
ঝ’রে গেলে অকস্মাৎ, রক্তাপ্লুত ট্রাম থেমে গেলো। .  .   ”
আপনার ‘প্রার্থনা’ আমরা পাত্তা দেইনি। মনোবীজও সুফলা হয়নি তাই।
“আমাদের প্রভু বীক্ষণ দাও : মরি নাকি মোরা মহাপৃথিবীর তরে?
পিরামিড যারা গড়েছিলো একদিন-আর যারা ভাঙে-গড়ে;-
মশাল যাহারা জ্বালায় যেমন চেঙ্গিস যদি হালে
দাঁড়ায় মদির ছায়ার মতন- যত অগণন মগজের কাঁচা মালে;
যে-সব ভ্রমণ শুরু হ’লো শুধু মার্কোপোলোর কালে,
আকাশের দিকে তাকায়ে মোরাও বুঝেছি যে-সব জ্যোতি
দেশলাইকাঠি নয় শুধু আর-কালপুরুষের গতি;
ডিনামাইট দিয়ে পর্বত কাটা না-হ’লে কী করে চলে, –
আমাদের প্রভু বিরতি দিয়ো না; লাখো-লাখো যুগ রতিবিহারের ঘরে
মনোবীজ দাও : পিরামিড গড়ে- পিরামিড ভাঙে গড়ে।”
আপনি প্রাণান্তভাবে ‘শুভ রাষ্ট্র’ চাইতেন। জানতেন তা নির্মাণের পথ। অনেকবার লেনিন এসেছে আপনার কাব্যে। কিন্তু নবারুণ ভট্টাচার্যের স্যাটায়ার পড়ে বোধহয় সে লাইনেও আপনি একলা।
“জীবনানন্দ দাশের দুটো পেট্রল পাম্প ছিল
ছিল একটা স্পিড বোট
যাতে তিনি ধানসিঁড়ি নদীতে ডাক চেজ করতেন
জীবনানন্দ ইংরেজি জানতেন না
জীবনানন্দ বর্ধমানে সেটল করেন কারণ সেখানে ট্রাম নেই
জীবনানন্দ হেভি টিগরমবাজ ছিলেন
ফড়িং খেতেন, সালমান খানের চেয়ে
ডবল হরিণ তিনি মেরেছিলেন তুড়ি মেরে
জীবনানন্দ লাস্টে বুঝেছিলেন
বোকাচোদা বলে একটা শব্দ চালু হতে চলেছে
জীবনানন্দ সি.পি.এম-এর মেম্বার ছিলেন
যে পার্টি থেকে কবিতা লেখার অপরাধে
তিনি এক্সপেলড্ হন
অতএব আসুন
এবারের কবিতা উৎসবে
আমরা তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত
সেরিব্রাল হেমারেজ
সেলিব্রেট করি— চিয়ার্স!”
: নবারুণ ভট্টাচার্য’র পাণ্ডুলিপি থেকে অগ্রন্থিত কবিতাঃ ভাষাবন্ধব—নবারুণ সংখ্যা, ২০১৫
জীবনানন্দ দাশ, আপনার ‘ঊনিশশো চৌত্রিশে’র কবিতাই বাস্তব হয়েছে সব জানা শোনা বোঝা আপনার জীবনে। যেন অন্ধকারে অচল মোটরকার হয়ে পড়ে আছেন স্থবির।
“…
একটা মোটরকারের পথ- মোটরকার
সবসময়ই আমার কাছে খটকার মতো মনে হয়েছে,
অন্ধকারের মতো।
আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;
আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।
জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা
অন্য সবাই বহন করে করুক; আমি প্রয়োজন বোধ করি না :
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।”
বত্রিশতম জন্মদিনে আপনি ডায়েরিতে লিখেছেন,
“তুমি ব্যথা অনুভব করো, প্রপাগান্ডা করো, নইলে তোমার ব্যথা কে বুঝবে।”
ঊনপঞ্চাশতম জন্মদিনে লিখেছেন,
“বার্থ ডে আননোটিশড”।
আর আপনার ‘মাল্যবান’ উপন্যাস শুরু হয়েছে এইভাবে,
“ সারাদিন মাল্যবানের মনেও ছিল না, কিন্তু রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে অনেক কথার মধ্যে মনে হল বেয়াল্লিশ বছর আগে ঠিক এইদিনেই সে জন্মেছিল।”
আপনাকে নিয়ে গবেষণা করা গৌতম মিত্র তার ‘৪০ লক্ষ শব্দে গড়া মুদ্রাদোষ’ নিবন্ধে লিখেছেন,
“ঘড়ির কাঁটার মতো স্পর্শকাতর হিসাবে চিহ্নিত করেছেন নিজেকে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে প্রস্তুত ছিলেন, কেননা তিনি জানতেন সবসময়ই অপেক্ষা করতে হয়, অপেক্ষাই ফাইনাল। . .  ”
কিন্তু অপেক্ষা ফাইনাল হয়নি জীবনে। আপনি ফিরেছেন মৃত্যুর পর আপনার লেখা ভর্তি ট্রাঙ্কের ডালা খোলার পর। আপনাকে মনেহয় জেনে বুঝে এক জীবন হন্তারক।
“ . . .
জীবন ভালোবেসে হৃদয় বুঝেছে অনুপম
মূল্য দিয়ে আসছে চুপে মৃত্যুর সময়।”
: জীবন ভালোবেসে, অগ্রন্থিত কবিতা, জীবনানন্দ দাশ
১৯৫০ সালে ‘পূর্বাশা’ সম্পাদকের কাছে চার-পাঁচশো টাকা ‘এক্ষুনি চাই’ ধার চেয়ে লেখা এক চিঠিতে আপনাকে পাই এভাবে,
“ প্রিয়বরেষু,
  আশা করি ভালো আছেন।
বেশি ঠেকে পড়েছি, সে জন্য বিরক্ত করতে হল আপনাকে। এখুনি চার-পাঁচশো টাকার দরকার; দয়া করে ব্যবস্থা করুন।
এই সঙ্গে পাঁচটি কবিতা পাঠাচ্ছি, পরে প্রবন্ধ ইত্যাদি (এখন কিছু লেখা নেই) পাঠাব। আমার একটি উপন্যাস (আমার নিজের নামে নয়— ছদ্মনামে) পূর্বাশায় ছাপতে পারেন; দরকার বোধ করলে পাঠিয়ে দিতে পারি, আমার জীবনস্মৃতি আশ্বিন কিংবা কার্তিক থেকে পূর্বাশা’য় মাসে মাসে লিখব। সবই ভবিষ্যতে, কিন্তু টাকা এক্ষুনি চাই— আমাদের মতো দু-চারজন বিপদগ্রস্ত সাহিত্যিকের এ রকম দাবি গ্রাহ্য করবার মতো বিচার বিবেচনা অনেক দিন থেকে আপনারা দেখিয়ে আসছেন— সে জন্য গভীর ধন্যবাদ।
লেখা দিয়ে আপনার সব টাকা শোধ করে দেব, না হয় ক্যাশে। ক্যাশে শোধ করতে গেলে ছ’সাত মাস (তার বেশি নয়) দেরি হতে পারে। কবিতাগুলোর সবই এক সময়ে লেখা নয়। কবিতা বেছেই পাঠিয়েছি; তবু যদি কিছু অপছন্দ হয় আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারেন। কবিতা আপনার সুবিধামতো পূর্বাশায় কিংবা অন্য কোনো ভালো পত্রিকায় (উপযুক্ত টাকা দিলে ও মর্যাদা রাখলে) ছাপতে পারেন। জরুরি। আজকালই প্রত্যাশা করছি।
প্রীতি নমস্কার।
ইতি
জীবনানন্দ দাশ ”
এর উত্তরে টাকা এসেছিল কি-না জানা নেই। তবে আপনি থেমে ছিলেন না। তা মেস জীবনে না খেয়ে, পুঁই শাকের চচ্চরি ও কুঁচো চিংড়ির ঘণ্ট পেটে পুরেও বিশ্বাস করতেন মানুষের অলীক ক্ষমতায়।
“ গল্প লিখবার ঘণ্টা মুহূর্তগুলো মানুষের জীবনের খুব একটা উৎসর্জনের জিনিস বলে মনে হয়। মানুষ ভাত খেয়ে বাঁচে না শুধু। সে পুঁই শাকের চচ্চরি ও কুঁচো চিংড়ির ঘণ্ট খেতে পারে কিন্তু চিন্তা ও কল্পনা তবুও তার। সে পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ আবিস্কার করতে পারে, অদৃশ্য সমুদ্রের শব্দ শুনতে পারে, ভোরের রাঙা সূর্য্যে অর্ধনারীশ্বরের ভয়াবহ সুন্দর রূপ দেখতে পারে। . . .”
: জীবনানন্দ দাশের ডায়েরি।
খুঁজতে খুঁজতে না পেয়ে এখন স্বপ্নেই দেখা হয় ‘মিলু’ ডাকনামের জীবনানন্দ আপনার সাথে। এখন মনেহয় নির্জনতার কবি আর আপনি নন। আপনাকে ঘিরে এখন লাখো কোটি ফ্যান ফলোয়ার। তাদের রক্তের ভেতর বিপন্ন বিস্ময় খেলা করে। তখন আপনিই সহায়।
আপনার রূপসী বাংলা আজও শুভ রাষ্ট্র হয়নি। চারপাশে বেনিয়াদের দাপট। পৃথিবীর অবস্থাও একই রকম। মারী, যুদ্ধ, শিশু মৃত্যু, দুর্ভিক্ষ আপনার সময়ের মতোই বিরাজমান।
বেঁচে থাকা এখনও নির্মম। তাই আপনার প্রয়াণের এই ক্ষণে অনেকের মনেই মরিবার সাধ জাগে।
‘স্বপ্নের হাতে’ কবিতায় লিখেছিলেন,
“পৃথিবীর যত ব্যথা,- বিরোধ,- বাস্তব
   হৃদয় ভুলিয়া যায় সব!
   চাহিয়াছে অন্তর যে – ভাষা,
   যেই ইচ্ছা – যেই ভালোবাসা
   খুঁজিয়াছে পৃথিবীর পারে পারে গিয়া,-
   স্বপ্নে তাহা সত্য হয়ে উঠেছে ফলিয়া!”
তাই স্বপ্নের ওপরই ভরসা। স্বপ্নেই দেখা হয় মিলু আপনার সাথে। আত্মার সারথি হয়ে থাকুন ঘাস হয়ে ফিরে আসার পূর্বাবধি।

জীবন কথা

মধু সূদন পাল

আমি ভাবনা হতে পারি,
           যদি..তুমি আমায় নিয়ে ভাবো।
আমি কথা হতে পারি,
           যদি..তুমি সেই কথা লেখো।
আমি আলো হতে পারি,
            যদি..তুমি প্রদীপ হয়ে থাকো।
আমি বই হতে পারি,
             যদি..তুমি সেই বই পড়ো।
আমি নক্ষএ হতে পারি,
             যদি..তুমি আকাশ হয়ে থাকো।
আমি পাখি হতে পারি,
             যদি..তুমিপাখনা হয়ে থাকো।
আমি নদী হতে পারি,
              যদি.. তুমি বালি হয়ে থাকো।
আমি চর হতে পারি,
               যদি.. তুমি সেই চরে ঘর বাঁধো।।
‘পাতালের সর্বনাশা অন্ধকার গাঢ় হয়ে এলে’ যে কবিকে স্মরণ করতে হয়, তার নাম নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। কাব্য তখন অস্ত্রবাণ হয়ে ওঠে। তোষামোদে তৎপর জাতকে তিনি মনে করিয়ে দেন প্রকৃত সত্য যে, ‘রাজা উলঙ্গ’।

সেই কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর জন্মবার্ষিকীতে…

সত্যজিৎ চ্যাটার্জী

শুভ জন্মদিন, কবি!
এখনের ভৌগলিক সীমায় নির্ধারিত ফরিদপুরের চান্দ্রা গ্রামে ১৯২৪ সালের এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবের শিক্ষার বুনিয়াদ গ্রামের পাঠশালায়। সঙ্গে পারিবারিক শিক্ষার আবহে শিশু নীরেন্দ্রনাথের কাব্য প্রতিভার বিকাশ। প্রথম কবিতা লেখেন পাঁচ বছর বয়েসে। যদিও তা প্রকাশ করেননি কোথাও। কলকাতায় যখন আসেন, তখন বয়স মাত্র ৬ বছর।
প্রথমে বঙ্গবাসী স্কুল। পরে মিত্র ইনিস্টিটিউটে স্কুলবেলা কাটে। ১৯৪২ সালে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আই. এ. পাশ করে সেন্ট পলস্ কলেজ থেকে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে বি. এ. পাশ করেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
ছাত্রজীবন থেকে সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন নীরেন্দ্রনাথ। এ কাজকেও তিনি মনে করতেন এক ধরনের কাব্য। হাত খরচ জোগাতে ‘দৈনিক প্রত্যহ’ পত্রিকায় কাজ শুরু। এরপর কাজ করেন “সত্যযুগ” পত্রিকায়। সুদীর্ঘ কর্মজীবনে সম্পৃক্ত ছিলেন “মাতৃভূমি” ও “ভারত”  পত্রিকায়। ‘ইউনাইটেড প্রেস অফ ইন্ডিয়া’য় কর্মরত ছিলেন এই কবি। ১৯৫১ সালে যোগ দেন আনন্দবাজারে। তার সম্পাদনায় প্রকাশ হতো ‘আনন্দমেলা’। সংবাদপত্র ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
১৯৫৪ সালে বাংলা কবিতা নতুন স্বর পায় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর আগমনে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’ এর সাক্ষর। এরপর একের পর এক প্রকাশ। মুদ্রিত হতে থাকে তার কবিতা, গল্প, উপন্যাস। ‘ঘুমিয়ে পড়ার আগে’ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী থামেননি।
বিপুল সৃষ্টির মাঝে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী অসামান্যভাবে বিরাজ করেন ‘কলকাতার যীশু’, ‘অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল’ আর পূর্বোক্ত ‘উলঙ্গ রাজা’র মতো কালজয়ী ও বহুল আলোচিত কবিতার জন্য। ‘উলঙ্গ রাজা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৭৪ সালে তিনি ‘সাহিত্য আকাদেমি’ পুরস্কার অর্জন করেন। সৃষ্টিগুণে তার ঝুলিতে পুরস্কার ও সম্মাননা কম নয়। ১৯৫৮ সালে লাভ করেন ‘উল্টোরথ পুরস্কার’। ১৯৭০ সালে ‘তারাশঙ্কর স্মৃতি পদক’ পান তিনি। ১৯৭৬ সালে ‘আনন্দ শিরোমণি’ পুরস্কারে ভূষিত হন কবি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সাম্মানিক ডি. লিট প্রদান করে ২০০৭ সালে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘বঙ্গবিভূষণ’ পুরস্কারও আছে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অর্জনে।
২০১৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর ফ্যাকাসে হয়ে যায় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর প্রয়াণে।
দীর্ঘ সাহিত্য যাত্রায় লিখেছেন হাত মেলে। শুধু কবি নন ছোটগল্পকার, উপন্যাসিক হিসেবেও নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী স্বতন্ত্র। তার সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র ভাদুড়ী মশাই বিপুল পাঠক প্রিয়।
২০১৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেছিলেন,
“ লিখতে না পারলে বেঁচে থাকা অর্থহীন। ঈশ্বরকে আমরা ‘দত্তাপহারী’ নামে ডাকি। এই শব্দের অর্থ হলো, তিনি যা দেন তা আবার কেড়ে নেন। দেখার ও শোনার ক্ষমতা, ঘ্রাণের ক্ষমতা, কাউকে ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি এগুলো আমরা ঈশ্বরের কাছ থেকে পাই। একসময় তিনি আমাদের কাছ থেকে এসব ফিরিয়েও নেন। আমি এখন চোখে কম দেখি, কানে কম শুনি। মানে ঈশ্বর ফিরিয়ে নিচ্ছেন এখন। লেখার ক্ষমতাটা এখনো তিনি ফিরিয়ে নেননি। এটা যদ্দিন ফিরিয়ে না নিচ্ছেন, তদ্দিন যেন বাঁচি। তারপর আর বেঁচে থাকার ইচ্ছে নেই। ”
এ উক্তি যেন মনে করায় মার্কেজের ‘বলার জন্যই বাঁচা’কে। প্রকৃত কবিতা ও কবির মৃত্যুতে বিনাশ নেই। নীরেন্দনাথ চক্রবর্তী রোদ্দুরের মতোই উদ্ভাসিত আজও।

লক্ষ্মী না তুই দূর্গাসাজ

পূরব ব্যানার্জী

ওই মেয়ে তুই নয় অবলা ,
সমাজের এসব কারসাজি !
ঘোমটা দিয়ে,বোরখা দিয়ে,
বন্দি করার ফন্দিবাজি ।।
পাপ পুণ্যের দোহাই দিয়ে,
সোনার খাঁচায় বাঁধার ছক ।
পুরুষ শুধুই ভোগ লালসায় ,
তোর মহিমায় মেটায় শখ ।।
রূপ সজ্জার সাথে একটু ,
তালিম দে কুস্তি কসরতে ।
বোমা বারুদ পিস্তলে আজ,
শান দিতে শেখ দিন রাতে ।।
দয়া মায়া মমতা সব ,
মনের ভেতর রাখ চেপে ।
যুগে যুগে এই সুযোগেই,
পুরুষ তোদের যায় মেপে ।।
শঙ্খ উলুধ্বনি ভুলে এবার,
লক্ষ্মী নয় তুই দূর্গা সাজ ।
মহামায়ার অট্টহাসি হেসে ,
দে ভেঙে এই পুরুষ রাজ ।।
কন্যা ভগিনী মা এসবই,
এদের মুখের ভাষ্য তে ।
নয়লে পরের মেয়ের পানে,
কোন লালসায় ওৎ পাতে ।।
সব পুরুষই অসৎ জানিস ,
মুখোশ পরে সৎ সাজে ।
নইলে আজও কোন সাহসে,
ধর্ষকেরা টিকে আছে !!

পা কমছে (শুভ বিজয়া)
********

দেবাশিস সেনগুপ্ত

বয়স বাড়তেই গুণতিতে রোজ কমছে প্রণামের পা,
শুভ বিজয়ার আশীর্বাদে আর মাথা ঝোঁকাই না।
এইতো সেদিন বিশাল ছিল আমার পরিবার,
এখন কেবল ছোট্ট ঘরে একা আমিই আমার।

জ্যাঠার স্নেহ, পিসির আদর, কাকার আবদার,
কোথায় কখন হারিয়ে গেল যৌথ পরিবার।
পড়ে মনে দুর্গা ভাসান আর বেলপাতায় লেখা,
ওঁ শ্রী শ্রী দুর্গা সহায় লিখতে হাতের ব্যথা।

সেই ব্যথাটাই আজকে কেন খুঁজছে আমার মন!
তবুও জানি আজও স্মৃতির হয়নিকো মরণ।
সেই বিজয়ার সন্ধ্যা রাঙা আর সারি পায়ের সার,
প্রণাম সেরেই কোলাকুলি, দাদুর বুকে আমার।

আপন কত প্রাণের মানুষ, গুরুজনের সারি
আশীর্বাদ আর ঘুগনি, নিমকি, মিষ্টি রকমারি।
পাড়ার সকল বাড়িতে ঘোরা আর বন্ধুদের আপডেট
আরে লালবাড়িতে শিগগিরি যা, দিচ্ছে যে কাটলেট।

কতক চেনা আর অর্ধজানা, চেনা অচেনার ভিড়,
কোথাও ছিল দরাজ হাসি আর কোথাও বা গম্ভীর।
কোন্ ক্লাসে পড়ছো তুমি আর বাপের কি নাম!
কোন্ স্কুলে পড় তুমি বা কোনটা তোমার ধাম!

কোথায় কবে হারিয়ে গেলো সেই দাদু, জ্যাঠার দল,
আমরা এখন হাতেগোনা চেনা গণ্ডির ফল।
হারিয়ে গেল পাড়ার মানুষ আর অবাক স্নেহের এর শাসন,
এখন শুধুই ফেসবুকেতে সকাল বিকাল ভাষণ।

আমরা যারা চল্লিশোর্ধ্ব তারাই বোধহয় খুঁজি,
সেই ছোটো বেলার বিজয়া আর লুচির সাথে সুজি।
দিনকাল সব পাল্টে গেল, নিকট হলো দূর,
নেই সে প্রাণের টান আর আচার চুরির দুপুর।

হোয়াটস অ্যাপেই পাচ্ছি প্রণাম, হোয়াটস অ্যাপেই মিষ্টি,
হোয়াটস অ্যাপেই আশীর্বাদ আর তাতেই খুঁজি তুষ্টি ।
এই দুনিয়ায় ব্যস্ত সবাই, কেউ খোঁজ করে না আর,
কম পড়ছে মাথায় হাত আর কমছে পা ঝোঁকার।

শারদীয়া অবসানে শপথ

পূরব ব্যানার্জী

 

বিসর্জনের ঘন্টায় বিষাদের অভিব্যক্তি ,
উদাসী মুখ ,নীরব বিমর্ষ প্রকৃতি !
ক্লান্ত দিবাকর ঢলে পড়ে ওই আরক্তিম সন্ধ্যায়,
স্তব্ধ মৌমাছির গুঞ্জন ———–
মনখারাপির বিষণ্ণতা সকালের সূর্য উদয়ে ,
পাখিরা ও যেন আজ নিশ্চুপ বিহ্বল !!
ঢাকের কাঠিতে বাজে বিদায়ী সানাইয়ের সুর-
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে,
শারদীয়া উৎসব বাঙালির হৃদয়,
অন্তর্মন জুড়ে ।।
বছর ভরের প্রতীক্ষা ———–
ছোট্ট শিশু থেকে বাড়ির বড়,সবারই অন্তরে !
দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা সব ফিকে ,সে যেন-
কেবলই শারদবরণ তরে !!
মৃন্ময়ী মায়ের চিন্ময়ী রূপ মণ্ডপে মন্দিরে,
আহাঃ এ মহামিলন উৎসবে থাক বেঁচে বাঙালি –
যুগ হতে যুগান্তরে ।।
উঠুক জেগে মহামায়া সকল মাতৃ ভগিনী রূপে,
ঘরে ঘরে হোক দূর্গা পূজা ,
সারাটা বছর ধরে !!
মুছে যাক যত হিংসা দ্বন্দ্ব, ধুয়ে যাক যত পাপ ———–
জাগরূক হোক বাঙালিয়ানা,
মা আসুক ফি বছর ঘুরে ।।
শপথের বন্যা বহে যাক আজ শারদীয়া অবসানে,
প্রতিটি দূর্গা বাঁচুক স্বাভিমানে ,
নিপীড়ন রুখে দিক প্রতিবাদে , রণাঙ্গিনী প্রতি উত্তরে !!
নির্ভয়া নয় ,অভয়ার রূপে নারীত্ব জেগে উঠুক———–
বাঙলার বুকে শারদীয়া ,
সম্প্রীতির বন্ধনে যাক জুড়ে ।।

নবমীর মনোলগ

অভি চক্রবর্তি

যাই যাই নবমীতে বেশ জোরে গান বাজছে পাড়ার পুজোয়, আলোগুলো যেন শেষবারের মতো উজ্জ্বল হয়ে রোশনাইয়ে ছেয়ে দিচ্ছে পাড়া গ্রাম নগর শহর…ক্লান্ত টোটো একটা অতিরিক্ত ঠাকুর দেখিয়ে বাড়িতে নামাচ্ছে তার শেষ সওয়ারীকে, সারাদিনের রোজগার জমিয়ে এবারে সে নিজের স্ত্রী সন্তান বা বৃদ্ধ মা- বাবাকে সঙ্গে করে বেরোবে টহল দিতে, আজই একমাত্র এই সুযোগ নিয়েছে সে। রোজগার যদি পরিবারকে আনন্দ নাই দ্যায়, রোজগার যদি সবসময়ই ভয়ে ভয়ে রাখে তাহলে সে রোজগারের কোনো মানে হয়না…এসব ভাবতে ভাবতে হয়তো মাঝে দাঁড়িয়ে পড়বে কোনো একলা এগরোল বা বিরিয়ানির দোকানের সামনে। খানিক ঠান্ডা হলেও নিজের অর্জনের অর্থে বাবা- মা, স্ত্রী- সন্তানকে এই সামান্য খাবার খাওয়াতে খাওয়াতে সে লক্ষ করবে, তার প্রতিবিম্ব আকাশের কালপুরুষের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। সে চিকচিকে চোখের কোণা মুছে তাকাবে পরিবারের সেই দুর্দান্ত আনন্দিত হাস্যময় মুখগুলোর দিকে। তারার মতো উজ্জ্বল মনে হবে নিজেকে। সে জানে এই হাসিতে, এই ঔজ্জ্বল্যে শ্রমের এবং সারল্যের নৈস্বর্গিক আনন্দ আছে…সে আবেগমথিত না হয়ে তাড়া লাগায়…আরো ঠাকুর দ্যাখাতে হবে যে, আজ সারারাত ঠাকুর দ্যাখাবে সে…সে জানে কুয়াশা আরেকটু পরেই প্রাচীন চাদোয়ার মত ধ্রুবতারা ও তাদের মাঝে এক অসমাপ্ত আচ্ছাদন তৈরি করবে, এই হিমে একরকম ঠান্ডা লাগার সম্ভাবনা থাকে জেনেই সে স্ত্রীকে পই পই করে বলেছে বড় আঁচলের শাড়ি পরে আসতে, মা- বাবা নিয়ে এসেছেন হালকা চাদর, মেয়ে স্কার্ফ। নিম্নবিত্ত মানুষ চাঁদের মতো মিতব্যায়ী হয়, রোজ এতো কম কম করে ফুরায় সে যে শেষের সেদিনে কোনো বড় ধাক্কা লাগেনা জীবনে। স্ত্রীকে নিয়ে সে একটু লুকিয়ে টোটোর পিছনে যায়, একটু দ্যাখে…একটু আদিম মস্করা করতে চায়…স্ত্রী লজ্জা পায়, জেগে থাকে চাঁদের আলো, শ্রমের ঘাম। আসলে বাড়িতে দেড়খানা ঘরে শেষ কবে যে স্ত্রীকে সে দেখেছে মনে করতেই পারেনা। অনেকের বাড়িতে অনেক ঘর তবুও কতো মানুষের পরিবারের সঙ্গে দ্যাখা হয়না, এ কথা একবার টোটোতে উঠে বলেছিল একজন। সে মানেই বোঝেনি…স্ত্রীর লুটিয়ে পড়া হাসি আর জ্যোৎস্না মিলেমিশে গিয়ে এক হয়ে যায়…ওরা গাড়িতে ওঠে, নিজের গাড়ি। নিজেই ড্রাইভার। নিজের স্ত্রী, নিজের বাবা মা…এই জীবনে এতো আলো জ্বলেছে আজকে যে পাড়ায় পাড়ায় থিম সাজের এল ই ডি ফিকে হয়ে গ্যাছে…নবমী নিশিকে সে জ্বালিয়ে দিতে পেরেছে আক্ষরিক অর্থেই…

আসলে আজকাল কে যে কাকে নিয়ে ঘুরতে বেরোয় ও ঠিক বোঝেনা, এই ছোট্ট টোটোতে কতো পাপ যে জমে ও টের পায়। টোটোর দুদিকের ঢাকনা ফেলে দেয় অনেকেই…টোটোতেই যদি ওরা এসব করে, কালো কাঁচ ঢাকা গাড়িতে কীনা কি করে? এ জন্যই সে প্রত্যহ শ্মশানে গিয়ে টোটোটার গায়ে হাওয়া লাগিয়ে আনে, সে জানে শ্মশানের হাওয়াতে নাকি পাপ থাকেনা। শুধু নানান মানুষের বিষন্ন একলা স্মৃতি উড়ন্ত ছায়াদের সঙ্গে নৃত্য করে।

আকস্মিক বমির মতো উঠে আসে ওর…ঠান্ডা এগরোল জানান দ্যায় এখনো সে মিশে যায়নি…জীবন এগোয়, সেও এগোয় ধীরে ধীরে… অল্প হর্ন বাজিয়ে বাজিয়ে এক নিশ্চিত বিসর্জনের দিকে…যেখানে বিষাদের দ্যাখানেপনা নেই, বরণের অহৈতুকি উন্মাদনা নেই বরং ছুটির পর কাজে ফেরার এক অসামান্য উৎযাপন আছে। এসব ভাবে ভাবে আর ভারি হয় হিম, আসন্ন শীতের হিম…

বিদায়-বেলায়

রঞ্জিত নায়েক

নবমীর তিথি রাত, কতটুকু রয় বাকী প্রহর সমাপনে,
সমাগতা ঐ দশমীর ভোর, দিতে হবে পাড়ি কৈলাস-পানে।
আকূল প্রতীক্ষায় চেয়ে থাকা পথ – উমা কাছেতে আসার,
এলে ভরে মায়ের মন – মাতে জগৎবাসী খুশীতে অপার।
দুঃখসুখের ভাগী উমা, মেটাতে নাকাল নিত্য সংসার জ্বালা,
জুড়োতে আসে তাই বাপের বাড়ি, মায়ের ভুবন ক’রে আলা।
মা মেয়ের হয় আলাপন, কথায় কথায় ফুরায় দিনের সময়,
চকিতে শিয়রে নবমী নিশি, কেঁপে ওঠে পরাণ, বিয়োগ ব্যথায়।
গর্জে ওঠে মর্ত্যে ঢাকের বাদ্যি – শেষ রজনীর পূজা আরতি,
ধূনোর ধোঁয়ায় ঢাকে শৈলসূতার মনমোহিনী অনিন্দ্য মূরতি।
না হেরিলে সদা গৌরীমুখ – ভয়ে বিহ্বলে ভারী হয় বুক,
পলকে না হারায় আনন্দময়ী, নয়নে রয় অতৃপ্ত কন্যাসুখ।
পথ চাওয়ার দীর্ঘ বারোমাস্যা – জমা অন্তরে শত কান্না বেদনা,
মেলে দেখা দিন চারেকের – ভুলে থাকা মনের নীরব যাতনা।
জননী অভাগীর কাঁদে প্রাণ – ওহে নিঠুর নবমী নিশি,
পার হয়োনাকো বাকী রাত – ছেড়ে যাবে নয়নমণি দশভুজা মাহেশী।

একটু ভাবিস মাগো
কালাকার

বাজছেরে ঢোল বাজছে কাঁসি
পুজোর ছোঁয়ায় সবাই ভাসি
চল ছুটে যাই মণ্ডপে,
দুগ্গি এলো ওই প্যান্ডেলে
সন্তান সহ সদল বলে
ঘরে মন রয় আদপে?

নানা থিমের ছড়া ছড়ি
দর্শক কুলতো হুড়োহুড়ি
তর্ সইছেনা রে দেখবে!
প্রণাম তারে গিয়ে ভুলে
কেবল তারই সেলফি তুলে
ফোন গ্যালারি যে ভরবে!

নতুন জামা হয়নি দীপুর
কেঁদে কেটে সারা দুপুর
খালি গায়ে যায় প্যান্ডেল,
ডুকরে কাঁদে ভিড়ের চাপে
চেয়ে রয় সে খুব সন্তাপে,
হারিয়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল!

মাগো তুমি চক্ষু তোলো
ওই দীপুদের দুঃখগুলো
পারিস যদি করনা দূর,
সোনার চামচ চায়না ওরা
ভাতের গন্ধে পেটটা ভরা
ওরাই সেই ভক্ত বিদুর!
——————–//——

 মায়ের মেয়ে উমা

নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস

ইন্দ্রনগর, বহরমপুর

ধরায় মা এসেছে
উমা, মায়ের ঘরে,
শ্বশুর বাড়ি কৈলাস
স্বামী মাথার পরে।
ডানে লক্ষ্মী বামে সরস্বতী
ভাই কার্তিক সাথে গণপতি,
পাঁচদিনের অতিথি ভবে
ওরাই ধরার গতি।
দুর্গতি নাশিনী দুর্গা নাম
খড়্গ হাতে ,ভূবন মোহিনী রূপ,
রঙ্গের রাণী ও কুহকিনি,
সঙ্গীরা এবার হবে কি চুপ?
মায়ের ছেলে চোখের জলে
রাস্তায় বসে কাঁদে ,
ছলনাময়ী মা সেজেছে ,
ফেলতে তারে ফাঁদে।
মেঘ করেছে সপ্তমীতে
আকাশের মুখ ভার,
বেকারের দল রাস্তায়
করছে যে হাহাকার।
হয় নাহয় মায়ের হৃদয়।
ব্যথায় বিশ্ব সংসার,
হাজারো ভাবনা তারই বুকে
জান কতনা তার ভার?

ফুটপাতের দুর্গা

তাপস কুমার বর

০১.১০.২২
_________________________
গর্জে উঠেছে পূজোর ঘন্টা
কোথায় লুকিয়ে বলো না আমার মানবতা!
ওদের উৎসব ভিড়ের মাঝে
কাঁদছে বাটি হাতে
দাও না দু-মুঠো অন‍্য মুখে তুলে।
ছেঁড়া বস্ত্র নোংরা পা-জামা
খাদ‍্যের ভিড়ে উৎসব ও গেছে মরে।
দিন-রাত ওরা ফুটপাতে মরে
দুটো পায়সা দেবে গো বাবু
চিৎকার করে বলে!
ওই কোলের শিশুটা আজও কাঁদে
সভ‍্য দুটো পয়সা দেবে!
আমার দুর্গা কাঁদছে দেখো
রাস্তার অলি-গলি প্রান্তরে।
আমার দুর্গা বেঁচে ও মরে গেছে
দু-মুঠো খাদ‍্যের লড়াই লড়তে লড়তে।
কতদিন ওরা দরজায় ঘুরবে
ওদের জন‍্য একটু স্বাধীনতা এনে নেবে!
হয়তো ওরা নিরক্ষরতায় ভুগছে
ওরা ও স্কুল কলেজের স্বপ্ন দেখে!
আমার দুর্গা কেঁদে মরে
দু-মুঠো খাদ‍্য জোটেনি ওরা ও আছে অনাহারে।
আমরা কি আজও মানুষ হয়েছি,
উত্তর মানবতা একবার তুমি কি দেবে?
ধুঁকে ধুঁকে ওরা চোখের সামনে মরে
মা নেই,ওই ছোট্ট খোকা কাঁদে।
তবু আমরা বলি সভ‍্য হয়েছি
উৎসবের মহড়ায় মেতে মেতে।
ওই দেখো ওরা অনাহারে মরে
চিৎকার করে মা মা বলে।
আমার দুর্গা হারিয়ে গেছে
লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণার ফুটপাতে!
            °°°°°°°°°°°°

একটু ভাবিস মাগো
লাকাকার

ঢাকের পিঠে পড়লো কাঠি
মহাষষ্ঠী যে আজ,
তোর আবাহন দূর হোক সে
দুঃখ বেদনা লাজ!

শিউলি বকুল আত্মহারা
সাথে শুভ্র ঐ কাশ,
পুজো পুজো গন্ধে ম ম
খুশির টাটকা সুবাস!

তবু একটু খটকা মনে
ভেবে ওদের কথা,
দিন আনে খায় কাল ঘাম ছুটে
বুকে জমাট ব্যথা!

একটু কিন্তু ভাবিস মনে
ওই দুগ্গার কথা,
দুটো অন্নের যোগাড় জন্য
কতো দুঃখ ব্যথা!

পদ ঘাটেতে হয় যে ধর্ষিত
খুঁইয়ে নারীর লজ্জা,
কেমন লাগে ঝলমল প্যান্ডেল
অপরূপা সজ্জা!?

চেতন ফেরা সব জল্লাদের
না শুনলে কররে বধ,
ওরাই যে তোর আসল অসুর
এই ধরনীর আপদ!

মানুষ কেন হয় অমানুষ
জাগায় তারে পশু,
বিবেকটাকে টেনে লাগাম
মন করে দে শিশু!

বিদ্যাসাগরের শেষ জীবন
____ নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। ইন্দ্রনগর। বহরমপুর।
ধুপ আগুনে পূড়ে সুগন্ধ ছড়ায় । ধুপের ন্যায় কত মনীষী জন্মেছেন পৃথিবীতে । তাঁরা মানব সমাজের সেবায় জীবন উৎসর্গ করেছেন । বিনিময়ে পেয়েছেন বিশেষ শ্রদ্ধা ও সম্মান । কেউ কেউ কোথাও অশিষ্ট আচরণের শিকার ও হয়েছেন । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাদেরই একজন মহান পুরুষ । যৌবন ভোর যাদের জন্য সুখ শান্তির চিন্তা করে অদম্য অক্লান্ত অপরিসীম পরিশ্রমে জীবন উৎসর্গ করে গেলেন ; তাঁরা তাঁকে কতটুকু মনে রাখলেন । শেষ জীবনের বত্রিশটা বৎসর কেমন কেটেছে জেনেও সম্পূর্ণ অনুভব করা সহজ নয় । কতখানি দুর্বিষহ অন্তর্জ্বালা বুকে বয়ে বেড়িয়েছেন । সময়টা ছিল ১৮৭৫ সাল ৩১ শে মে । বিদ্যাসাগর ছিলেন কলিকাতায় তাঁর বাদুড় বাগানের বাড়িতে ।গভীর রাতে দোতলার একটি নিভৃত কক্ষে বসে উইল করলেন । উইলে ছেলে নারায়ণকে সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করলেন । অথচ সেই ছেলেই বছর দুয়েক আগে তাঁর মুখ রক্ষা করেছিলেন । ১৮৭০ সালে কৃষ্ণনগরের বিধবা কন্যা ভবসুন্দরীকে বিবাহ করে তাঁর বিধবা বিবাহ আন্দোলকে সম্মান জানিয়ে মুখ উজ্জ্বল করেছিল । সেই ছেলেকে ১৮৭২ খৃষ্টাব্দে ত্যাজ্য পুত্র করলেন । আত্মীয় পরিজন বন্ধু-বান্ধবদের দুর্ব্যবহারে বীতশ্রদ্ধ বিদ্যাসাগর সব থেকে আঘাত পেয়েছিলেন পুত্র নারায়ণচন্দ্রের থেকে । তিনি চেয়েছিলেন নারায়ণ কলিকাতায় তাঁর কাছে থেকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠুক ।অন্তরায় তাঁর পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় । নাতিকে কলিকাতায় পাঠাতে নারাজ । তাঁর সামনেই ঠাকুর্দার স্নেহান্ধ উন্মুক্ত প্রশ্র্য়ে উছশৃঙ্খল জীবন যাত্রায় অহর্নিশ তলিয়ে যাচ্ছে । ক্রমান্বয়ে পুত্রের ব্যবহারে দগ্ধ হতে থাকছেন ।বাধ্য হয়েই তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করে সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিলেন । অনেকে বলেন ঠাকুরদাসের সঙ্গে নারায়ঞ্চন্দ্র ক্ষমা প্রার্থনা করলে বিদ্যাসাগর ক্ষমা করেছিলেন ।বিদ্যাসাগরের জীবিত কাল ৭০ বৎসর দশ মাস । তাঁর শেষ বত্রিশ বছরকে সমালোচকরা অবরোহণ কাল বলে চিহ্নিত করেন । তাঁর পারিবারিক অশান্তিকে অনেকে দায়ী করেছেন । বাড়িতে থাকা সত্বেও গোপনে তাঁর ভাইয়েরা ,জননী ভগবতীদেবী ও স্ত্রী দীনময়ীর সমর্থনে যে বিবাহের ব্যবস্থা করেছিলেন বিদ্যাসাগরের তাতে ঘোর আপত্তি ছিল । অনুষ্ঠানের কথা জানা মাত্র আত্মীয় পরিজন সকলকে ডেকে জানিয়ে দিলেন আজ থেকে জন্মভূমি বীরসিংহ গ্রাম , সমস্ত আত্মীয় পরিজন চিরদিনের জন্য পরিত্যাগ করলাম । বলে কলিকাতার পথে রওনা দিলেন । জীবদ্দশায় বীরসিংহ গ্রামে আর আসেননি । সমালোচকদের মতে বিদ্যাসাগরের বিচ্ছেদ , নৈরাশ্য শুধু পারিবারিক অশান্তিই মূল হতে পারেনা । তদানিন্তন সময়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অপ্রত্যাশিত ,অপ্রত্যক্ষ দুর্ব্যবহার মনে আঘাত করেছিল । কাশীনাথ তর্কালঙ্কার ,ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন , রামতনু তর্কসিদ্ধান্ত , প্রমুখ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু । বাল্যবিধবা বিবাহ আন্দোলনে পূর্ণ সহযোগিতা করে ও পরে বিরোধিতা করেন ।তাঁর আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাজা রামমোহন রায়ের পুত্র রমাপ্রসাদ রায় ,ব্রাহ্মণ সমাজের তরুণ তার্কিক নেতা কেশব সেন , বিধবা বিবাহের প্রবল সমর্থক , বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী , মেদিনিপুরের প্রগতিশীল মানুষ বলে পরিচিত কেদারনাথ দাস বিধবা বিবাহে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে যুক্ত থেকেও আকস্মিক ভাবে সরে দাঁড়ান । শুধু তাই নয় ,বহুবিবাহ প্রথার পক্ষে ঘনিষ্ঠ বন্ধু দ্বারকানাথ বিদ্যারত্ন , তারানাথ তর্কবাচস্পতি আকস্মিক ঘুরে দাঁড়ানো বিদ্যাসাগ্রকে বিস্মিত করেছিল ।একের পর এক বন্ধু বিচ্ছেদ ঘটতে থাকে । অন্যদিকে পাশ্চাত্য চিন্তা ভাবনায় ভাবিত বুদ্ধিজীবীদের অনেকে যেমন রাজেন্দ্রলাল মিত্র ,ভূদেব মুখোপাধ্যায় , জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় নবগোপাল মিত্র কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ও সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ক্রমান্বয়ে আক্রমণ করেছিলেন ।অর্থ সমস্যা , ক্রমাগত আক্রমন অন্যত্র ; যাদের জন্য জীবনমরণ পণ করে লড়াই করছেন তাদের কেউ কেউ সুযোগ বুঝে বিরোধিতায় সঙ্গ দিচ্ছে । এই সমস্ত কারনে নিদারুণ আঘাত পেয়ে ক্লান্ত অবসন্ন বিদ্যাসাগরের শেষ জীবন বিষাদে পরিণত হয়েছিল ।
বিদ্যাসাগর নিঃসঙ্গ হলেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক সময়ে – বলেছিলেন “বিদ্যাসাগর সমকালীন শিক্ষিত সমাজকে অতিক্রম করে একটি এলিট সমাজে প্রবেশ করেছিলেন সত্য । কিন্তু সেখানেও তাঁর স্থান ছিল অনেক দূরে এক নিভৃত কোণে । নিঃসঙ্গ এই মানুষটি সমাজের সেই এলিট শ্রেনিকে অতিক্রম করে কাল জয়ী মহাকাব্যিক চরিত্রে নিজেকে পরিণত করেছিলেন ”। শেষে অবসন্ন ক্লান্ত বিদ্যাসাগর এক সময় তাঁর সমস্ত কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন । সমস্ত আত্মীয় স্বজন ও কলিকাতা জীবন পরিত্যাগ করে চলে এলেন সাঁওতাল পরগণার কারমাটাড়ে । সহজ সরল আদিবাসী মহলে শান্তির স্থান বেছে নিলেন । নিভৃতে একান্তে জীবন অতিবাহিত করার চেষ্টা করলেন । জীবন সায়াহ্নে অসুস্ততার কারনে অনেক দেরিতে ফিরে এলেন কোলকাতার বাদুড় বাগানের বাড়িতে ।
১৮৯১ সালের ২৯ শে জুলাই রাত্ ১১ টায় ; নিজ বাসভবনে বঙ্গ ভারত মাতার এক দুর্দমনীয় জেদি সন্তানের জীবনদীপ চিরতরে নিভে গেল । রেখে গেলেন তাঁর বিশাল কর্মকাণ্ডের দৃষ্টান্ত । যা বিশেষ করে বাঙালিকে সভ্যতা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রেরণা যুগিয়ে চলেছে ।
________ রচনা-৩০/০৯/২০২২

ইচ্ছে

 উজ্জ্বল সেনগুপ্ত

 

কমলা আর সাদা রঙে ইচ্ছের আঁচল ভর্তি

ইচ্ছে আজ ভীষণ খুশী মনে ভীষণ ফুর্তি ।।

ভাইকে নিয়ে সকাল সকাল স্নান নিয়েছে সেরে

ভেসে আসছে ঢাকের আওয়াজ মন গিয়েছে ভরে ।।

ভোরের আলোয় পাখির ডাক, চিকমিকে ওই সবুজ ঘাস,

মালা গাঁথছে ইচ্ছে আজ, আগমনীর পূর্বাভাষ ।।

বাবুদের বাড়ি প্রসাদ দেবে, মেঘগুলো সব ছুটছে

ভাইকে নিয়ে দৌড়ে ইচ্ছে, বাবুদের বাড়ি যাচ্ছে ।।

ঢাক বাজছে, কাঁসর বাজছে, আনন্দে সব নাচছে

নুতন জামায় দাদাদিদিরা সবাই কতো খেলছে ।।

সবার পাতে খিচুড়ি ভোগ, বসে সবাই খাচ্ছে

ডান্ডা নিয়ে মুছো লোকটা, ঢুকতে গেলেই বকছে ।।

অনেক পরে লাইন দিয়ে খিচুড়ি পেল ইচ্ছে

এক কোনে বসে ইচ্ছে, ভাই আনন্দে খাচ্ছে ।।

একটু ঢুকতে দিল না ওরা, রৌদ্রে ঘেমে ইচ্ছে

দুগগা মা কি শুধুই ওদের, মালাও নিল না ইচ্ছের??

পরনে পুরোনো শাড়ি, দাঁড়িয়ে ভাবছে ইচ্ছে

ওদের আছে নূতন জামা, তাইতো  ঢুকতে  দিচ্ছে ??

দুগ্গা মা ওদেরই কেন, নূতন জামা দিচ্ছে?

ভাইকে দেবেই নুতন জামা, এটাই এখন ইচ্ছে ।।

এসেছে শরৎ পরের বছর, কাশ ফুল্গুলি দুলছে

নূতন জামায় ইচ্ছেরা বাবুদের বাড়ি যাচ্ছে ।।

ঢাকের তালে নূতন জামায় আনন্দে সব নাচ্ছে

মুছো দারোয়ান আবার কেন ঢুকতে গেলেই বকছে?

  গিন্নী মাকে হঠাৎ পেয়ে চেঁচিয়ে বলে ইচ্ছে

দেখনা ও ঢুকতে গেলেই লাঠি দেখিয়ে বকছে ।।

একগাল হেসে গিন্নীমা বলে আসতে কাছে

গিন্নীমা যেন দুগ্গা মা, ওদের ঢুকতে দিচ্ছে ।।

ভাই কে নিয়ে ইচ্ছে প্রান ভরে মা কে দেখছে

অসুর দেখে ভাই বলে দ্যাখ মুছোকেই মারছে ।।

খিচুড়ি আর প্রসাদ পেয়ে ওরা আনন্দে খাচ্ছে

মা দুগ্গার আশীর্বাদে ইচ্ছেপুরণ ইচ্ছের ।।

দীনের দুর্গোৎসব
মধু সূদন পাল

শরতের আকাশ নীলাভ রঙের
ফুলে ফুলে ভরেছে বন।
পাখিদের গানে সুমধুর টানে
মা দুর্গার আগমন।
ঘরে ঘরে রকমারি সাজে
নতুনত্ব পোশাকের বাজার।
বাবুরা সব আনন্দে মশগুল
মিটিয়ে টাকা হাজার।
আমাদের ঘরে ছেঁড়া পোশাক
জোটেনা জামা গায়ে।
রাতটা কাটে গাছের তলায়
থাকেনা চটি পায়ে।
খিদের জ্বালায় কখনো যদি
পাতি আমাদের হাত।
জুটেছে হাজার লাঞ্ছনা তবু
দেয়নি কেউ ভাত।
আমরা শিশু অন্নহারা
কেউ দেখেনা চোখে।
অবশিষ্ট ফেলছে তবু
দেয়না খেতে লোকে।
এভাবেই শত দুঃখ নিয়ে
না খেয়েই পুজো কাটে।
বাবুরা সব ব্যস্ত দেখি
পুজোই মেতে ওঠে।

শিল্পনীড় নির্মিত ২০০৪ সালের দূরদর্শন ধারাবাহিক “কবিতার স্বপ্ন শরীর”-এ প্রয়াত কবি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার

585
SHARES
3.2k
VIEWS

শিকল ভাঙার গান

কৌশিকী সেনগুপ্ত

******

গল্প লিখতে গিয়ে প্লট খুঁজে ফিরি আমরা। কিন্তু গল্প থাকে আমাদের হাতের কাছেই। মনের আয়নায়, হৃদয়ের আতসকাচের পুত আলোকে সিন্ধু সেঁচে খুঁজে নিতে হয় শুক্তিঅভ্যন্তরের খাঁটি মুক্তো, শুকনো কাদার খোলস ছাড়িয়ে চিনে নিতে হয় বৈদূর্যমণি। জীবনসমূদ্রের স্রোতে ভেসে ভেসে এমন অনেক মনি মুক্তোই কুড়িয়ে চলেছি আমি।

শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত থাকায় কৈশোরের কাঁচামনের আবেগঘন দোদূল্যমানতা বড় কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ আসে অবারিত সমূদ্রের অগনিত স্রোতের মতোই, তাই আপ্লুত হই, আবেগতাড়িত হই বারেবারে। তেমনই একটা  আপাতকোমল ছোট্টমেয়ের জীবনযুদ্ধের গল্প বলব আজ।

কয়েক বছর আগেকার কথা। একটা মেয়ে এল আমাদের স্কুলে, অন্যপ্রদেশ থেকে।ফর্সা টুকটুকে, নীল-সাদা টিউনিক,কোঁকড়া চুল দুপাশে বিনুনি  ফিতে দিয়ে টাইট করে বাঁধা।

ক্লাস ফাইভের সব বাচ্চাই বড্ড আদুরে,’তুমি -তুমি’ করে কথা  বলে, যে যার নিজস্ব স্বাতন্ত্রে, সারল্যে উজ্জ্বল। আমাদের প্রতিদিনের গল্পে তাদের মজাদার সরল উপস্থিতি, একরাশ তাজা হাওয়ার মতো ।

এই মেয়েটিকে ভালো লেগেছিল তার ছটফটে চালচলন, তুড়বুড়ে  কথা, আর একসাথে অনেক কিছু বলে দেওয়ার প্রচেষ্টা দেখে।যেন অনেক কাজ বাকি, এই দরকারি কথা কটা শেষ করে বাকি কাজগুলো সেরে ফেলতে হবে তার এখনই ।

কিন্তু ওই ছোট্ট মানুষটা যে কত  বড় যুদ্ধ নিয়ে এগিয়ে চলেছে, জানতাম না তখনও।জানলাম অনেক পরে।

ওর মা আসতেন সাথে। কড়া পাহারায় দিয়ে যেতেন স্কুলে, নিয়ে যেতেন সাথে করে। কঠিন শাসনে রাখতেন মেয়েকে। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে মেয়েটি। কোনো একদিন কোনো সামান্য দুষ্টুমি  করা বা ক্লাসে কথা বলার কারণে মাকে স্কুল থেকে জানানো হলে মা রাস্তায় মেরেছিলেন মেয়েটিকে, মনে আছে। মায়ের সাথে আলাদাভাবে কথা বলি, বোঝাই। মায়ের কথা শুনে একটু অন্যরকম লাগে।

বাচ্চা মেয়ে, সুন্দর দেখতে, এইসময় চারপাশের প্রলোভন আসে অনেক। সেই ডাকে সাড়া দেবার কোনো ইচ্ছা ছিল না মেয়েটির,জানতাম আমি। ঝোড়ো হাওয়ার বেগকে কি কখনও  নুড়ি পাথর আটকাতে পারে! বাইরের কোনো ডাক আসতেই পারে। তবুও মেয়েটিকেই শাসন করতেন ওর মা। ও বলাতে সেই বিষয়েও ওর মাকে ডেকে বুঝিয়েছি আমি।

ওর নিষ্পাপ দুষ্টুমিতে অজান্তেই একটু আশকারা দিতাম হয়তো, যদিও বকুনিও অনেক খেত, তবুও !

ও হয়তো বুঝতো আমাকে। যা কিছু হতো বলতো আমাকে এসে। স্বচ্ছ্বল পরিবার, বাবা- মার একমাত্র মেয়ে, কোনো অভাব নেই। তবে অভাব একটা ছিল অবশ্যই।

তখন বোধহয় ক্লাস টেন। খুব মনখারাপ করে এসে একদিন আমাকে বললো,”- “দিদি,মাকে একটু বোঝান না,আমাকে  মাধ্যমিক পাশ করার পরই দেশে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিয়ে দেবে বলছে । আমি অনেক কান্নাকাটি করেছি,বাবা তবুও বুঝছে, মা কিছুতেই বুঝছে না।আমাদের বিড়াদড়িতে এত বড় মেয়ে ঘরে রাখেনা।খুব ছোট বয়সে সবার বিয়ে হয়ে যায়।দেশে গেলে সবাই মাকে জিজ্ঞেস করে তোমার মেয়ের বিয়ে কবে দেবে?”

-“তোমার মাকে আসতে বলো, কথা বলবো”।

বোঝালাম, ভুল করেও এই পথে পা দিও না। জীবন শেষ হয়ে যাবে।ছোট বয়সে বিয়ে করলে জীবন কীভাবে নষ্ট হয়ে যায় তুমি দেখেছ তো !

বললো,”হ্যাঁ দিদি আমি অনেক বড় হ’ব, নিজের পায়ে দাঁড়াবো। কিছুতেই এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবো না।”

তার চোখের দৃঢ়তা দেখে ভাবলাম, পারবে তো মেয়েটা, কী জানি ! আরও একটা স্বপ্ন না ভেঙে যায়। আরও একটা সম্ভাবনার কুঁড়ি না মুচড়ে মুশড়ে যায় বৃন্ত থেকে।

যাই হোক,যা ভেবেছিলাম , মা এলেন না দেখা করতে। কদিন পর হন্তদন্ত  সে এল আমার কাছে -“দিদি আপনি লিখে দিন, নাহলে মা আসবে না।”

লিখে দিলাম “একটু দেখা করুন,বিশেষ প্রয়োজন।”

মা এলেন ক’ দিন পরে। বোঝালাম অনেক। কতটা বুঝলেন জানিনা। মেয়েটা যুদ্ধ করে গেল।মাধ্যমিক পাশ করলো,ভালোই করলো রেজাল্ট। হায়ার সেকেন্ডারি পাস করলো।এবারও রেজাল্ট বেশ ভালো।মুখে সেই চিরকালীন এক আকাশ ভরা ঝলমলে হাসি।প্রণাম করে গেল। জিজ্ঞেস করলাম বাড়ির কী অবস্থা? একগাল হেসে বললো, ঠিকঠাক, আর আগের মতো চাপ নেই দিদি। বুকটা কেমন ভার ভার ঠেকল। জড়িয়ে ধরে আদর করেই দিলাম।

তারপর আর জানিনা কিছুই ।

বিপুল সমূদ্রস্রোতের মতো ওরা যায় আসে। চিহ্ন রেখে যায়। আবার ঢেউ আসে, উথাল পাথাল হয় হৃদয় বালুতট। আমার সেই মেয়েটিও কোথায় ভেসে গেল।

তারপর অনেকদিন কেটে গেছে।ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দেখাও হয় না। একদিন চোখে পড়লো একটা নাম। একসেপ্ট না করে পারলাম না।মেসেঞ্জারে মেসেজ এল,”দিদি কেমন আছেন?” তারপর অনেক কথা হলো ছাত্রী- শিক্ষিকার। বললো,”ও এখন সিভিল ইন্জিনিয়ারিং পড়ছে, থার্ড ইয়ার। মা বিয়ের কথা আর বলেননা”। ওর জন্য দেশের বাড়িতে ওদের পরিবারের এখন আলাদা সম্মান। ওর বয়সী অন্য মেয়েরা দুঃখ করে, বলে,তোর মতো যদি পড়াশোনা করতে পারতাম, তাহলে কত ভালো হতো আমাদের।

পায়ের শিকল কেটে গেছে পাখির। সে এখন মুক্ত আকাশ পেয়েছে।

ভারতবর্ষের মতো আর্থসামাজিক পটভূমিতে মেয়ে হয়ে জন্মানোর দূর্ভোগ অনেক। তবু তো এরা যুদ্ধ করছে,যুদ্ধ জিতছে।

এমন মেয়ে আমাদের আরও আছে। তারাও যুদ্ধ করছে নিজ নিজ ক্ষেত্রে,পরিসরে অনেকেরটা জানতে পারি, কতকটা পারিনা জানতে ।

আমাদের স্নেহে,ভালোবাসায়, কোমলতায় কিছুটা হলেও মসৃন হোক,নরম হোক ওদের বন্ধুর পথ। আমাদের অনুভূতি, শুভকামনা থাক ওদেরই জন্য। হৃদয় ফল্গু হোক অনন্ত স্রোতে। ওরা ভালো থাকুক, জয় আসুক। এগিয়ে চলো তোমরা, চরৈবেতি।….

( প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে)

585
SHARES
3.2k
VIEWS

Welcome Back!

Login to your account below

Create New Account!

Fill the forms bellow to register

*By registering into our website, you agree to the Terms & Conditions and Privacy Policy.

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?