সুপ্রিম কোর্ট ও কলকাতা হাইকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট প্রতীক মজুমদার, যিনি ভক্তমহলে প্রতীক মহারাজ নামে পরিচিত, পবিত্র শাঁকরাইল ভোলাগিরি আশ্রমের অধ্যক্ষ মহারাজের আশীর্বাদ ও নির্দেশনায় সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেছেন। পবিত্র নাগপঞ্চমীর শুভ তিথি থেকে তিনি তাঁর নতুন সন্ন্যাসী নাম স্বামী প্রতিকানন্দ গিরি মহারাজ হিসেবে পরিচিত হবেন—শাঁকরাইল, হাওড়ার শ্রীশ্রী ভোলাগিরি আশ্রমের একনিষ্ঠ সন্ন্যাসী ও সাধক হিসেবে। তাঁর সন্ন্যাসগুরু স্বামী আত্মানন্দ গিরিজি মহারাজ, প্রজ্যোগুরু স্বামী জয়দেবানন্দ মহারাজ এবং ছোটিগুরু স্বামী তেষানন্দজি মহারাজ। তাঁদের পবিত্র সান্নিধ্য, আশীর্বাদ ও গুরুপরম্পরার নির্দেশনায় স্বামী প্রতিকানন্দ গিরি মহারাজের এই সন্ন্যাসজীবনের পথচলা শুরু হল। সন্ন্যাস কেবলমাত্র পোশাক বা পরিচয়ের পরিবর্তন নয়—সন্ন্যাস হল ত্যাগ, সংযম, আত্মশুদ্ধি, সাধনা, ঈশ্বরানুসন্ধান এবং মানবকল্যাণে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণের এক মহৎ সংকল্প। জাগতিক জীবনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে আত্মজ্ঞান ও পরম সত্যের সন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত করাই সন্ন্যাসধর্মের মূল সাধনা।
শ্রীশ্রী ভোলানন্দ গিরি মহারাজের পবিত্র উত্তরাধিকার
শ্রীশ্রী ভোলানন্দ গিরি মহারাজ, যিনি ভক্তদের কাছে ভোলাগিরি মহারাজ নামে পরম শ্রদ্ধেয়, ছিলেন ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণের এক বিশিষ্ট ভারতীয় সন্ন্যাসী ও মহাত্মা। ১৮৩২ সালে পাঞ্জাব অঞ্চলে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তাঁর অন্তরে জাগ্রত হয়েছিল গভীর বৈরাগ্য ও আত্মসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা। যৌবনেই তিনি সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসজীবন গ্রহণ করেন এবং পরম শ্রদ্ধেয় গুরু স্বামী গোলাবগিরি জি মহারাজের শরণাপন্ন হন। গুরুর সেবায় ও কঠোর সাধনায় তিনি প্রায় বারো বছর অতিবাহিত করেন। এই সময়ে তিনি আধ্যাত্মিক শিক্ষা, ধ্যান, তপস্যা ও গুরুসেবার মধ্য দিয়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেন। পরবর্তীকালে হিমালয়, তিব্বতসহ ভারতের বিভিন্ন পবিত্র ভূমিতে দীর্ঘকাল পরিভ্রমণ ও সাধনা করে তিনি গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি অর্জন করেন। পরিশেষে তিনি পবিত্র গঙ্গাতীরে হরিদ্বারে অবস্থান করেন এবং সেখান থেকেই তাঁর সাধনা, শিক্ষা ও মানবসেবার এক মহৎ অধ্যায় শুরু হয়।
তিনি হরিদ্বারের লালতা পাথে শ্রীশ্রী ভোলানন্দ সন্ন্যাস আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। আশ্রমটি পরবর্তীকালে সন্ন্যাসী, সাধক ও গৃহস্থ ভক্তদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সেখানে সাধনা, সংস্কৃত শিক্ষা, বৈদিক অনুশীলন এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ধর্ম ও সমাজসেবার এক অনন্য সমন্বয় গড়ে ওঠে।ভোলানন্দ গিরি মহারাজের অন্যতম বিশেষ অবদান ছিল সন্ন্যাসী ও গৃহস্থ সমাজের মধ্যে আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধন সৃষ্টি করা। তিনি দেখিয়েছিলেন যে আত্মজ্ঞান ও ধর্মীয় চেতনা কেবল নির্জন সাধনায় সীমাবদ্ধ নয়; তা মানুষের কল্যাণ, সমাজসেবা এবং মানবিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়েও প্রকাশিত হতে পারে।
তাঁর জীবন, সাধনা ও শিক্ষার ধারাকে অনুসরণ করে পরবর্তীকালে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু আশ্রম ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়—যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থান উল্লেখযোগ্য।
৮ মে ১৯২৯ তারিখে স্বামী ভোলানন্দ গিরি মহারাজ তাঁর নশ্বর দেহ ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর সাধনা, আদর্শ, গুরুপরম্পরা এবং মানবকল্যাণের বার্তা আজও অগণিত সন্ন্যাসী ও গৃহস্থ ভক্তকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
কর্মযোগ, জ্ঞান ও মানবসেবার আদর্শ ভোলাগিরি পরম্পরার মূল সাধনা হল কর্মযোগ, জ্ঞান, ভক্তি, তপস্যা, বৈদিক সংস্কার এবং মানবসেবা। সমাজের কল্যাণে দান, সেবা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বৈদিক যজ্ঞ, সংস্কৃত শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক জাগরণের মাধ্যমে এই পরম্পরা সনাতন ধর্মের চিরন্তন আদর্শকে সমাজের মধ্যে প্রসারিত করে চলেছে। আজ সেই পবিত্র গুরুপরম্পরার ছায়াতলে স্বামী প্রতিকানন্দ গিরি মহারাজের সন্ন্যাসজীবনের শুভ সূচনা হল। আইনের জগতে দীর্ঘদিনের কর্মজীবনের পর আজ তিনি জীবনের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করলেন—নিজের জন্য নয়, আত্মসাধনা, ধর্মরক্ষা, সমাজসেবা এবং মানবকল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার সংকল্পে।
গুরুদেবের চরণে তাঁর জীবন হোক সমর্পিত। তাঁর সাধনাপথ হোক আলোকিত। তাঁর কর্ম হোক মানবকল্যাণের জন্য। তাঁর জীবন হোক সনাতন ধর্ম, গুরুসেবা ও পরমাত্মার সন্ধানে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শ্রীশ্রী ভোলানন্দ গিরি মহারাজের চরণে শতকোটি প্রণাম। সমস্ত গুরুপরম্পরার চরণে বিনম্র প্রণাম। স্বামী প্রতিকানন্দ গিরি মহারাজের সন্ন্যাসজীবনের জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা ও প্রার্থনা।
ॐ नमः शिवाय।
জয় গুরুদেব।
জয় শ্রীশ্রী ভোলানন্দ গিরি মহারাজ।
জয় সনাতন ধর্ম।
