পশ্চিম মেদিনীপুর, ১৮ জুলাই: সাঁতার কেবল প্রতিযোগিতা বা পদক জয়ের বিষয় নয়; এটি এমন একটি জীবনরক্ষাকারী দক্ষতা, যা বিপদের মুহূর্তে একটি মূল্যবান প্রাণ বাঁচাতে পারে। এই বার্তাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিশ্ব জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে শনিবার চাইল্ড ইন নিড ইনস্টিটিউট (সিনি) এবং মেদিনীপুর সুইমিং ক্লাবের যৌথ উদ্যোগে পশ্চিম মেদিনীপুরে আয়োজন করা হয় এক বিশেষ সচেতনতামূলক কর্মসূচির। অনুষ্ঠানে ছিল সচেতনতামূলক র্যালি, জল নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা, বিভিন্ন বিভাগে সাঁতার প্রতিযোগিতা, ওয়াটার পোলো, ডাইভিং এবং পুরস্কার বিতরণ। আয়োজকদের বক্তব্য, এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য প্রতিযোগিতা নয়; বরং শিশু-কিশোর ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপদ সাঁতার শেখাকে জনপ্রিয় করে তোলা এবং জল নিরাপত্তাকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা।
সাম্প্রতিক রাজ্যব্যাপী সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় জলে ডুবে মৃত্যুর হার বেশ উদ্বেগজনক। তাই এই অঞ্চলে নিরাপদ সাঁতার শেখানো, জল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জীবনরক্ষাকারী দক্ষতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ভারত সরকারের জাতীয় আন ইন্টেনশনাল ইনজুরি প্রিভেনশন গাইডলাইন এ উভয় ক্ষেত্রেই নিরাপদ সাঁতার শেখাকে জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সেই বার্তাকেই মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং সচেতনতামূলক র্যালির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত মেদিনীপুর কোতোয়ালি মহিলা থানার ইন্সপেক্টর শ্রীমতি কবিতা দাস অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের বিধায়ক ডা. শঙ্কর গুছাইত, জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর এর প্রতিনিধি, মেদিনীপুর সুইমিং ক্লাবের সম্পাদক পল্লব কিশোর চট্টোপাধ্যায়, কার্যকরী সভাপতি আশিস চক্রবর্তী, সভাপতি অতনু ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক শান্তনু ঘোষ এবং জাতীয় সাঁতারু আফরিন জাবি। চাইল্ড ইন নিড ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন সুজয় রায়, ন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি অফিসার এবং জেলা সঞ্চালক গৌতম মণ্ডল, এবং নৈরিতা দাস সিনির ন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি অফিসার সুজয় রায় বলেন, “ভারত সরকারের জাতীয় অনিচ্ছাকৃত আঘাত প্রতিরোধ নির্দেশিকা প্রকাশের প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন সময় এসেছে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়ে এই নির্দেশিকার সুপারিশগুলিকে দ্রুত বাস্তবায়নের। নিরাপদ সাঁতার শেখানো, শিশুদের নিরাপদ তত্ত্বাবধান, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ে সুরক্ষা ব্যবস্থা, উদ্ধার ও সিপিআর প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা—এই পাঁচটি স্তম্ভকে শক্তিশালী করতে পারলেই ২০৩৫ সালের মধ্যে জলে ডুবে মৃত্যুর হার ৩৫ শতাংশ কমানোর জাতীয় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। সাঁতার কোনও বিলাসিতা নয়; এটি প্রত্যেক শিশুর জীবনরক্ষাকারী দক্ষতা হওয়া উচিত।”
তিনি আরও জানান, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় সিনির উদ্যোগে কবচ নিরাপদ শিশু সুরক্ষা কেন্দ্র, ঝুঁকিপূর্ণ পুকুরে সুরক্ষা বেড়া, নিরাপদ সাঁতার প্রশিক্ষণ, উদ্ধার ও সিপিআর প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে, যা ভারত সরকারের জাতীয় নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ফ্রিস্টাইল, ব্যাকস্ট্রোক, ব্রেস্টস্ট্রোক ও বাটারফ্লাই বিভাগে সাঁতার প্রতিযোগিতা। পাশাপাশি আয়োজন করা হয় ওয়াটার পোলো, ডাইভিং এর। প্রায় ৮০ জন প্রতিযোগী বিভিন্ন বিভাগে অংশ নেন। সফল প্রতিযোগীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন বিধায়ক ডা. শঙ্কর গুছাইত। ইংলিশ চ্যানেল বিজয়ী সাঁতারু আফরিন জানান ” জল ছোট থেকেই আমাকে টানে তাই যাতে জলে না ডুবে বিপদ ঘটে আমার মা আমাকে সাঁতারে ভর্তি করেন। সব বাবা মায়ের উচিত ছোট থেকে সাঁতার শেখানো। কারণ পশ্চিমবঙ্গে প্রতিদিন গড়ে ২৫ জন জলে ডুবে মারা যায় যার ভিতর বেশির ভাগই শিশু। সাঁতার শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার সাথে সাথে জীবন ও বাঁচাতে পারে।”
আয়োজকদের পক্ষ থেকে সুস্মিতা পট্টনায়ক জানান , ১০ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড এবং অসমে বিশ্ব জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এ বছরের আন্তর্জাতিক থিম ইউনাইট টু টার্ন দা টাইড। অনুষ্ঠানের শেষে সকলকে জল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকার এবং প্রত্যেক শিশুকে নিরাপদে সাঁতার শেখানোর আহ্বান জানানো হয়। আয়োজকদের মতে, জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ কেবল একটি স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি সামাজিক দায়বদ্ধতা, দক্ষতা অর্জন এবং সমন্বিত উদ্যোগের বিষয়। নিরাপদ সাঁতারকে যদি প্রতিটি শিশুর নাগালে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে অসংখ্য অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
