web analytics

বিশেষ সংবাদদাতা,কলকাতা: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির উপর জোর দিল কেন্দ্র। শনিবার উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ির ঝুমাগাছ সীমান্ত চৌকি (বর্ডার আউটপোস্ট বা বিওপি) পরিদর্শনে এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সীমান্ত সুরক্ষায় ব্যবহৃত একাধিক দেশীয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি খতিয়ে দেখেন। পাশাপাশি ভার্চুয়াল মাধ্যমে প্রায় ৭৭ কোটি টাকার বিএসএফ পরিকাঠামো প্রকল্পের শিলান্যাসও করেন তিনি। সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রুখতে ‘স্মার্ট বর্ডার’-এর ধারণাকে সামনে রেখে চারস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার কথাও ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শনিবারের এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) অধিকর্তা, বিএসএফের মহাপরিচালক-সহ একাধিক শীর্ষ আধিকারিক। ঝুমাগাছ বিওপিতে পৌঁছে প্রথমেই সীমান্তে ব্যবহৃত আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা খতিয়ে দেখেন অমিত শাহ। বিএসএফ আধিকারিকেরা তাঁকে বিভিন্ন প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল রেডিও-ভিত্তিক ফেন্স ব্রিচ ডিটেকশন সিস্টেম। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া কেউ কাটার বা নষ্ট করার চেষ্টা করলেই এই প্রযুক্তি সঙ্গে সঙ্গে তা শনাক্ত করে এবং পূর্বনির্ধারিত সতর্কবার্তা সম্প্রচার করে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সতর্ক করে দেয়। ফলে অনুপ্রবেশের চেষ্টা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে নিরাপত্তা মহল।

এ ছাড়াও নদী, খাল বা দুর্গম এলাকার মতো জায়গায়, যেখানে কাঁটাতারের বেড়া টানা কঠিন, সেখানে বসানো ইনফ্রারেড অ্যালার্ম সিস্টেমও পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই ব্যবস্থায় অদৃশ্য ইনফ্রারেড রশ্মি ভেঙে গেলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা পৌঁছে যায় নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে। সীমান্তের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নজরদারি আরও কার্যকর করতে এই প্রযুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিএসএফ।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষ এবং কৃষকদের যাতায়াত যাতে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হয়, তার জন্য তৈরি বিশেষ গেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমও ঘুরে দেখেন অমিত শাহ। আধিকারিকদের মতে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সীমান্তে নিরাপত্তা বজায় রেখেই সাধারণ মানুষের চলাচল আরও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব হবে। পরিদর্শনের পাশাপাশি ভার্চুয়াল মাধ্যমে তিনটি বিএসএফ প্রকল্পের শিলান্যাস করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই প্রকল্পগুলির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে সদ্য অধিগৃহীত জমিতে দুটি সীমান্ত চৌকির জন্য প্রায় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন সীমান্ত বেড়া নির্মাণ প্রকল্পেরও সূচনা করেন তিনি। এই প্রকল্পে ব্যয় হবে আরও প্রায় ৩০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এ দিনের ঘোষিত প্রকল্পগুলির আর্থিক মূল্য প্রায় ৭৭ কোটি টাকা।

ঝুমাগাছ বিওপিতে ‘প্রহরী সম্মেলন’-এ বিএসএফ জওয়ানদের সঙ্গে সরাসরি কথাও বলেন অমিত শাহ। তাঁদের কাজের অভিজ্ঞতা, সীমান্তে কর্তব্য পালনের বিভিন্ন সমস্যা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। পরে সীমান্ত চত্বরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে অমিত শাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে দেশের প্রতিটি সীমান্তকে অভেদ্য করে তোলার লক্ষ্যেই কেন্দ্র কাজ করছে। সীমান্ত সুরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করতে চারস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় বা ‘কোয়াড্র্যাঙ্গুলার সিকিউরিটি গ্রিড’ গড়ে তোলা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত পরিকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং দ্রুত তথ্য আদানপ্রদানের সমন্বয়েই ভবিষ্যতের সীমান্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এই ‘স্মার্ট বর্ডার’ প্রকল্পের প্রাথমিক বাস্তবায়ন পশ্চিমবঙ্গ থেকেই শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই তাঁর দাবি।  তিনি আরও বলেন, দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত যে সমস্ত পরিকাঠামো প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারণে আটকে রয়েছে, সেগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জওয়ান এবং তাঁদের পরিবারের কল্যাণেও কেন্দ্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শিলিগুড়ি সফরে সীমান্ত-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও করেন অমিত শাহ। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত নিরাপত্তা, পরিকাঠামো উন্নয়ন, অনুপ্রবেশ রোধ এবং আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি রাজ্যে নতুন তিনটি ফৌজদারি আইন সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করার অগ্রগতি এবং জন্ম-মৃত্যু নথিভুক্তিকরণ ব্যবস্থা নিয়েও পৃথক বৈঠকে পর্যালোচনা করেন তিনি। কেন্দ্রের বক্তব্য, সীমান্ত সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং গোয়েন্দা নজরদারি আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত-সংক্রান্ত অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শনিবারের ঝুমাগাছ সফর সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।

SHILPANEER NEWSPAPER

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights